জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে ডিগ্রি পাস কোর্স থেকে পড়ে বিসিএস ক্যাডার হওয়াকে অনেকে অসম্ভব মনে করেন। সেই ধারণা ভুল প্রমাণ করে জীবনের প্রথম বিসিএস প্রচেষ্টাতেই সফল হয়েছেন শেখ তৌহিদুল কবীর, ৪১তম বিসিএসে প্রশাসন ক্যাডারে সুপারিশপ্রাপ্ত হয়ে। তাঁর এই সাফল্যের পেছনে আছে বাবাকে হারানোর কঠিন সময়, সামাজিক কটাক্ষের মুখোমুখি হওয়া এবং তার পরও থেমে না গিয়ে পরিকল্পিতভাবে এগিয়ে যাওয়ার গল্প।
এক নজরে
- ব্যাচ ও ক্যাডার, ৪১তম বিসিএস, প্রশাসন ক্যাডার, জীবনের প্রথম বিসিএস প্রচেষ্টাতেই সাফল্য
- শিক্ষা, রাজশাহী কলেজে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে ডিগ্রি পাস কোর্সে (বিএসএস) মেধাক্রমে তৃতীয়, পরে রাষ্ট্রবিজ্ঞানে প্রথম শ্রেণিতে মাস্টার্স
- পটভূমি, রাজশাহী সদরে জন্ম ও বেড়ে ওঠা, বাবার মৃত্যুর পর কঠিন সময় পার করে প্রস্তুতি চালিয়ে যাওয়া
- সহকর্ম, প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক ও পরে হিসাব মহানিয়ন্ত্রকের কার্যালয়ে অডিটর হিসেবে কর্মরত অবস্থায় বিসিএস প্রস্তুতি চালিয়ে যাওয়া
পিতৃবিয়োগ ও ডিগ্রি পাস কোর্সে ভর্তি
রাজশাহী সদরে জন্ম ও বেড়ে ওঠা শেখ তৌহিদুল কবীর শেখ রেজাউল করিম ও নাজমিনা বেগম দম্পতির ছোট সন্তান। ২০০৮ সালে এইচএসসি শেষ করার পর বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি পরীক্ষায় সফল হতে পারেননি তিনি। এরই মধ্যে বাবার ব্লাড ক্যান্সার ধরা পড়ে এবং ২০১১ সালে বাবাকে হারান তিনি, যা তাঁর জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেয়। একই বছর রাজশাহী কলেজে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে ডিগ্রি পাস কোর্সে ভর্তি হন তিনি, যে সিদ্ধান্তের জন্য অনেকের কটু কথাও শুনতে হয়েছিল তাঁকে। তবে দমে না গিয়ে নিজের মধ্যে কিছু করে দেখানোর দৃঢ় সংকল্প তৈরি করেন তিনি।
প্রস্তুতির শুরু, মাস্টার্স ও চাকরিজীবন
ডিগ্রি দ্বিতীয় বর্ষে পড়ার সময়ই চাকরির প্রস্তুতি শুরু করেন তৌহিদুল, যেখানে তাঁর বড় ভাই মেন্টরের ভূমিকা পালন করেন এবং তাঁর পরামর্শ-দিকনির্দেশনাতেই বিসিএসের পথচলা শুরু হয়। সেশনজটের কারণে ২০১৪ সালে হওয়ার কথা থাকা ডিগ্রি ফাইনাল পরীক্ষা শেষ হয় ২০১৬ সালে, রাজশাহী কলেজে বিএসএসে মেধাক্রমে তৃতীয় হন তিনি। ২০১৮ সালে রাষ্ট্রবিজ্ঞানে প্রথম শ্রেণিতে মাস্টার্স ফাইনাল শেষ করে চাকরির পরীক্ষা দেওয়া শুরু করেন, ডিগ্রি থেকেই প্রস্তুতি শুরু করায় তখন নিজের মধ্যে একধরনের আত্মবিশ্বাস তৈরি হয়েছিল বলে জানান তিনি। একই বছর প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক পদে আবেদন করেন এবং ২০২০ সালে সেই পদে নিয়োগ পান, ঠিক সেই সময়ই ৪১তম বিসিএসের বিজ্ঞপ্তি প্রকাশিত হয়, যা ছিল তাঁর জীবনের প্রথম বিসিএস। এর মধ্যে ২০২২ সালে হিসাব মহানিয়ন্ত্রকের কার্যালয়ে অডিটর পদেও নিয়োগ পান তিনি।
লিখিত পরীক্ষার প্রস্তুতি কৌশল
ডিগ্রিতে পড়ার সময় প্রিলিমিনারিকেন্দ্রিক প্রস্তুতি নিয়েছিলেন তৌহিদুল, নিজের দুর্বল দিকে বিশেষ যত্নশীল হয়ে ছোটবেলার গণিত-ভীতি কাটাতে গণিতে বাড়তি সময় দেন, পাশাপাশি অন্য বিষয়গুলোতেও সমান গুরুত্ব দেন এবং কোচিংয়ে ভর্তি হয়ে নিয়মিত ক্লাস-পরীক্ষায় অংশ নেন। ২০২১ সালে ৪১তম বিসিএসের প্রিলি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার পর আত্মবিশ্বাস বহুগুণ বেড়ে যায় বলে জানান তিনি। লিখিত পরীক্ষার প্রস্তুতিতে বাজারের প্রচলিত গাইড বইয়ের পাশাপাশি নিয়মিত অনুবাদ চর্চা করতেন, গণিতে আলাদা নজর দিতেন এবং বিভিন্ন তথ্য-উপাত্ত আলাদা খাতায় টুকে রাখতেন। হাতের লেখা ধীরগতির হওয়ায় একটি বিষয় পড়ার পর তা নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে খাতায় লেখার অনুশীলন করতেন, কারণ তাঁর মতে লিখিত পরীক্ষায় সময় ব্যবস্থাপনা একটি বড় নিয়ামক হিসেবে কাজ করে, বিশেষত বাংলা, বাংলাদেশ বিষয়াবলি, আন্তর্জাতিক ও বিজ্ঞান বিষয়ে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে পুরো প্রশ্ন শেষ করতে পারলে তা নম্বরপ্রাপ্তিতে বাড়তি সুবিধা দেয়। ইংরেজির জন্য নিয়মিত ফ্রিহ্যান্ড লেখার চর্চা করতেন এবং কোনো বিষয়েই মুখস্থনির্ভর না থেকে ধারণা নিয়ে লেখার চেষ্টা করতেন তিনি।
ভাইভা ও জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় নিয়ে ভুল ধারণা ভাঙা
২০২২ সালের নভেম্বরে লিখিত পরীক্ষার ফল প্রকাশের পর ভাইভা প্রস্তুতি শুরু করেন তৌহিদুল, শুরুতেই সংগ্রহ করেন ভাইভা বোর্ডের মুখোমুখি নামের একটি বই এবং প্রতি মাসের গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা আলাদা খাতায় নোট করে সাম্প্রতিক বিষয়ে ধারণা নেন। তাঁর পুরো ভাইভা বাংলায় অনুষ্ঠিত হয়। অনেকের মধ্যে প্রচলিত ধারণা আছে ভাইভা বোর্ডে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের গুরুত্ব কম দেওয়া হয়, নিজেও সেই আশঙ্কায় ছিলেন জানিয়ে তিনি বলেন এটি আসলে ভুল ধারণা, বোর্ডের আন্তরিকতা তাঁকে মুগ্ধ করেছিল। উত্তর জানা না থাকা প্রশ্নে বিনয়ের সঙ্গে দুঃখ প্রকাশ করতেন তিনি, কারণ ভাইভা বোর্ডে বিনয়ী আচরণের বিশেষ গুরুত্ব আছে বলে মনে করেন। অবশেষে আগস্টের ৩ তারিখ ফল প্রকাশিত হলে প্রশাসন ক্যাডারে সুপারিশপ্রাপ্ত দেখে নিজের চোখকেই প্রথমে বিশ্বাস করতে পারেননি তিনি।
Learnera.xyz-এর ব্যবহারিক শিক্ষা
- প্রতিষ্ঠানিক পটভূমি যাই হোক না কেন, পরিকল্পিত ও নিয়মিত প্রস্তুতি বিসিএসে সাফল্যের প্রধান শর্ত, প্রতিষ্ঠান নয়।
- নিজের দুর্বল বিষয়ে বাড়তি সময় দিন, ভয় পেয়ে এড়িয়ে যাওয়ার বদলে সরাসরি মোকাবিলা করুন।
- চাকরিজীবনের পাশাপাশিও বিসিএস প্রস্তুতি চালিয়ে যাওয়া সম্ভব, সময় ব্যবস্থাপনাই এখানে মূল চাবিকাঠি।
- লিখিত পরীক্ষায় নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে লেখার অনুশীলন করুন, বিশেষ করে হাতের লেখা ধীরগতির হলে।
- ভাইভা বোর্ড সম্পর্কে প্রচলিত ভুল ধারণায় ভীত না হয়ে বিনয় ও আন্তরিকতার সঙ্গে প্রস্তুতি নিয়ে অংশ নিন।
- ব্যর্থতা বা কঠিন পারিবারিক পরিস্থিতি লক্ষ্য থেকে সরিয়ে দেওয়ার কারণ নয়, বরং দৃঢ় সংকল্পের উৎস হতে পারে।
ভাইভা বোর্ডের গঠন ও কথোপকথনের ধরন নিয়ে আরও বিস্তারিত জানতে পড়ুন Learnera.xyz-এর বিসিএস ভাইভার পরিবেশ নিয়ে সার্বিক গাইড।
আপনার প্রস্তুতিতে প্রয়োগ করুন
প্রতিষ্ঠানের নাম নয়, পরিকল্পনা ও ধারাবাহিকতাই বিসিএসে সাফল্য নির্ধারণ করে। শুরু করতে Learnera.xyz-এর বিগত পরীক্ষার প্রশ্ন এবং স্টাডি গাইড ব্যবহার করতে পারেন। শেখ তৌহিদুল কবীরের অভিজ্ঞতা মনে করিয়ে দেয়, কঠিন পরিস্থিতিতেও লক্ষ্যে স্থির থাকতে পারলে প্রথম চেষ্টাতেই সাফল্য অসম্ভব নয়।