স্কুল থেকে ঝরে পড়া থেকে বিসিএস ক্যাডার: আনিসুর ও রাফসানের গল্প

শৈশবে আর্থিক সংকটে স্কুল থেকে ঝরে পড়া দুই ভাই আনিসুর রহমান ও রাফসান রুবেল ৪১তম বিসিএসে যথাক্রমে প্রশাসন ও কৃষি বিপণন ক্যাডারে সুপারিশপ্রাপ্ত হন।

BCS Failure to Success Success Story 41st Administration Agriculture Marketing
সাফল্যের সংক্ষিপ্ত চিত্র

আনিসুর রহমান ও রাফসান রুবেল

পরীক্ষা
৪১তম বিসিএস
মেধাস্থান
আনিসুর মেধাক্রম ২৪, রাফসান মেধাক্রম ৮
বর্তমান ভূমিকা
আনিসুর: ৪১তম বিসিএস, প্রশাসন ক্যাডার; রাফসান: ৪১তম বিসিএস, কৃষি বিপণন ক্যাডার (প্রতিবেদনের সময় রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংকের সিনিয়র অফিসার)
শিক্ষাগত যোগ্যতা
আনিসুর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ফিন্যান্স বিভাগে স্নাতক (রূপনগর ন্যাশনাল আইডিয়াল স্কুল, মিরপুর থেকে মাধ্যমিক), রাফসান শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে কৃষি অর্থনীতিতে স্নাতক, পরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে এমবিএ

জমে থাকা ৩ হাজার ৬০০ টাকা পরীক্ষার ফি দিতে না পারায় একসময় স্কুলেরই পরীক্ষায় বসতে পারেননি আনিসুর রহমান ও তাঁর তিন ভাই। বছরের পর বছর পেরিয়ে সেই দুই ভাই আনিসুর ও রাফসান রুবেল আজ ৪১তম বিসিএসে সরকারি কর্মকর্তা, একজন প্রশাসন ক্যাডারে মেধাক্রম চব্বিশ, অন্যজন কৃষি বিপণন ক্যাডারে মেধাক্রম আট।

পল্লবীর টিনের চালার সংসার

ঢাকার পল্লবী এলাকায় নিম্নমধ্যবিত্ত এক পরিবারে বেড়ে ওঠেন আনিসুর, ছয় ভাই ও এক বোনের মধ্যে সবার বড়। বাবা একটি ছোট প্রতিষ্ঠানে বেসরকারি চাকরি করতেন সীমিত আয়ে, মা ছিলেন গৃহিণী। টিনের চালার বাড়িতেই কেটেছে তাঁদের ছেলেবেলা। চার ভাই একসঙ্গে পড়তেন পল্লবী মাজেদুল ইসলাম মডেল হাইস্কুলে।

জীবনের দীর্ঘতম পথ

প্রথম সাময়িক পরীক্ষার আগে জমে থাকা বেতন ও পরীক্ষার ফি বাবদ ৩ হাজার ৬০০ টাকা পরিশোধ করতে না পারায় বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ চার ভাইকেই পরীক্ষায় বসতে দেয়নি। প্রধান শিক্ষকের কাছে অনুরোধ করেও সুযোগ পাননি আনিসুর। তিনি বলেন, তাঁদের সহপাঠীরা যে গেট দিয়ে পরীক্ষার হলে ঢুকছিল, সেই একই গেট দিয়ে তাঁরা চার ভাই ফিরে আসছিলেন খালি হাতে। বাড়ি ফেরার সেই পথটুকুকে পৃথিবীর সবচেয়ে দীর্ঘ পথ মনে হয়েছিল তাঁর কাছে, কান্না জড়ানো চোখে বাড়ি ফেরেন তাঁরা। ছেলেদের সেই অবস্থায় দেখেই মা বুঝে যান কী ঘটেছে, এবং ছেলেদের সঙ্গে কেঁদেছিলেন তিনিও।

এক শিক্ষকের অসাধারণ সহায়তা

ভাঙারি ব্যবসায়ী এক চাচার কাছ থেকে টাকা ধার নিয়ে মিরপুরের রূপনগর ন্যাশনাল আইডিয়াল স্কুলে নতুন করে ভর্তি হন আনিসুর। সেখানেই দেখা মেলে প্রধান শিক্ষক সুফিয়া হোসেনের সঙ্গে, যিনি বিনা পারিশ্রমিকে তাঁকে ইংরেজি পড়াতেন এবং প্রতি মাসে পাঁচশ টাকা আর্থিক সহায়তাও দিতেন, নিজের বাসায় ডেকে নিয়ে আলাদাভাবে পড়াতেন তিনি। আনিসুরের ভাষায়, যতটুকু ইংরেজি তিনি শিখেছেন তার সবটাই এই শিক্ষকের কাছ থেকে শেখা। ম্যাডামের এই ভালোবাসা তাঁর কাছে এখনো এক বিস্ময়, মানুষ এত ভালো হয় কী করে, এই প্রশ্ন এখনো ভাবান তাঁকে।

টিউশনি করে ভাইবোনদের পড়াশোনা চালানো

রূপনগর থেকে পাস করার পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ফিন্যান্স বিভাগে ভর্তি হন আনিসুর। নিজে যে বিষয়ে শিক্ষকের কাছে শিখেছিলেন, সেই ইংরেজিই টিউশনি করিয়ে নিজের পড়াশোনা ও ছোট ভাইবোনদের ফিরিয়ে আনার খরচ চালিয়েছেন তিনি। ছোট ভাই রাফসান রুবেল শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে কৃষি অর্থনীতিতে স্নাতক শেষ করে পরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে এমবিএতে ভর্তি হন।

বারবার চেষ্টা করে সাফল্য

আনিসুর এর আগে ৩৮তম ও ৪০তম বিসিএসে অ-ক্যাডার পদে সুপারিশ পেয়েও তা গ্রহণ করেননি। ২০১৯ সাল থেকে পল্লী কর্ম-সহায়ক ফাউন্ডেশনে (পিকেএসএফ) কর্মকর্তা হিসেবে চাকরি করা অবস্থাতেই প্রস্তুতি চালিয়ে যান। পাঁচ দিনে একুশ ঘণ্টার লিখিত পরীক্ষাকে সবচেয়ে কঠিন ধাপ বলে বর্ণনা করেন তিনি। তাঁর ভাষায়, চাকরি করা প্রার্থীরা কেবল পরীক্ষার দিনই ছুটি পান, আগে বা পরে নয়, ফলে দীর্ঘ পরীক্ষা টিকিয়ে রাখা কঠিন হয়ে দাঁড়ায়। একটি পরীক্ষার আগে অসুস্থও হয়ে পড়েছিলেন তিনি, তবু চালিয়ে গেছেন। তৃতীয় দফায় ৪১তম বিসিএসে এসে সাফল্য ধরা দেয় দুই ভাইয়েরই একসঙ্গে।

ভাইয়ের প্রতি শ্রদ্ধা, নিজের প্রতি প্রতিশ্রুতি

রাফসান বলেন, পুরো লড়াইটা আসলে তাঁর বড় ভাইয়ের একারই ছিল। বড় ভাইকে তিনি একজন অভিভাবকতুল্য মানুষ বলে বর্ণনা করেন, যিনি নিজের পড়াশোনা চালানোর পাশাপাশি ছোট ভাইবোনদের বড় করেছেন। বড় ভাইদের কেন মাথার ছায়া বলা হয়, তা নিজের জীবনেই বুঝেছেন বলে জানান তিনি। আনিসুরের কাছে সেই কান্নার স্মৃতি এখনো তাঁকে অতীত মনে করিয়ে দেয়, আর সেই স্মৃতিই তাঁকে আরও পরিশ্রম করার শক্তি জোগায়। একই রকম আর্থিক প্রতিবন্ধকতায় থাকা অন্যদের সহায়তা করার চেষ্টা করেন তিনি এখন, নিজের শিক্ষকের কাছে পাওয়া ঋণ যেন এভাবেই শোধ করেন।

Learnera.xyz-এর ব্যবহারিক শিক্ষা

  1. আর্থিক বাধায় পড়াশোনা থেমে গেলে শিক্ষক, পরিবার ও পরিচিতজনের সহায়তা চাওয়া থেকে পিছিয়ে যাবেন না।
  2. পরিবারে একজনের অগ্রগতি অন্য সদস্যদের শিক্ষার পথও খুলে দিতে পারে।
  3. চাকরির পাশাপাশি বিসিএস দিলে দীর্ঘ লিখিত পরীক্ষার জন্য শারীরিক ও মানসিক প্রস্তুতিও রাখুন।
  4. যে দক্ষতা দিয়ে নিজে এগিয়েছেন, টিউশনি বা সহায়তার মাধ্যমে সেটিই অন্যের কাজে লাগাতে পারেন।
  5. সুযোগ পেলে আর্থিক বাধায় থাকা শিক্ষার্থীদের পাশে দাঁড়ান, আনিসুর তাঁর শিক্ষকের সহায়তার প্রতিদান এভাবেই দিতে চান।
  6. একবার অ-ক্যাডার সুপারিশ পেলেও লক্ষ্য অন্য কিছু হলে হাল না ছেড়ে চেষ্টা চালিয়ে যান।

আপনার প্রস্তুতিতে প্রয়োগ করুন

আনিসুরের অভিজ্ঞতা দেখায়, চাকরির পাশাপাশি প্রস্তুতিতে লিখিত পরীক্ষার দীর্ঘ সময় ও ধারাবাহিকতা আলাদা চ্যালেঞ্জ। শুরু করতে Learnera.xyz-এর বিগত পরীক্ষার প্রশ্ন এবং স্টাডি গাইড ব্যবহার করতে পারেন। নিজের সময় ও শারীরিক সক্ষমতা বিবেচনায় বাস্তব পরিকল্পনা করুন; রাফসানের ভাষায়, একজন দায়িত্বশীল পথপ্রদর্শক পুরো পরিবারের যাত্রা বদলে দিতে পারেন।

সম্পর্কিত সাফল্যের গল্প

BCS Success Story 43rd Education

এইচএসসিতে ফেল, সিজিপিএ ২.৯৪ নিয়ে ৪৩তম বিসিএসে শিক্ষা ক্যাডারে সাদিকুর রহমান রাহাত

সাদিকুর রহমান রাহাত

এইচএসসিতে দুই বিষয়ে ফেল করে দ্বিতীয়বার জিপিএ ২.৯০ নিয়ে পাস করা এবং জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে অনার্সে সিজিপিএ ২.৯৪ পাওয়া সাদিকুর রহমান রাহাত শিক্ষকতা ও টিউশনি চালিয়ে…

গল্পটি পড়ুন →
BCS Success Story 43rd Police

ধৈর্যই এখানে ম্যাজিক, বিদেশ যাওয়ার পরিকল্পনা ছেড়ে ৪৩তম বিসিএসে পুলিশ ক্যাডারে সপ্তম শাওন রেজা

শাওন রেজা

বিদেশে গিয়ে স্থায়ী হওয়ার পরিকল্পনা বাদ দিয়ে দেশে থেকে ৪৩তম বিসিএসে পুলিশ ক্যাডারে সপ্তম হয়েছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শাওন রেজা। মুখস্থর বদলে বোঝাপড়া তৈরি করে পড়াশোনা আর…

গল্পটি পড়ুন →
BCS Failure to Success Success Story 43rd

বাবাকে হারিয়ে ভেঙে পড়েও ৪৩তম বিসিএসে তথ্য ক্যাডারে সুপারিশ পেলেন আশরাফুল ইসলাম ইমন

আশরাফুল ইসলাম ইমন

৪১তম বিসিএসের রিটেন পরীক্ষার দুই মাস আগে বাবাকে হারিয়ে ভেঙে পড়া আশরাফুল ইসলাম ইমন ৪৩তম বিসিএসে তথ্য ক্যাডারে সুপারিশ পেয়েছেন। বাংলাদেশ টেক্সটাইল বিশ্ববিদ্যালয়ের এই শিক্ষার্থী পরিবারের…

গল্পটি পড়ুন →