ক্যাডার সার্ভিস কখনোই নিশাত বিনতে রায়হানের নিজের স্বপ্ন ছিল না, পরিবারের ইচ্ছা আর নিজেকে যাচাই করার তাগিদ থেকেই ৪১তম বিসিএসে বসেন তিনি। তবে শুরুতেই একটি দৃঢ় সিদ্ধান্ত নিয়ে নেন, নিজের ভাষায়, “জীবনে একটা বিসিএসই দেব এবং সর্বোচ্চ প্রস্তুতি নিয়েই দেব।” একটি বিসিএসই দেওয়ার পরিকল্পনা ছিল তাঁর, তাই প্রথম সুযোগের প্রস্তুতিতেই নিজের সর্বোচ্চ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। শেষ পর্যন্ত পুলিশ ক্যাডারে মেধাক্রম চতুর্থ হয়ে সেই একটিমাত্র সুযোগকেই সফল করে তোলেন তিনি, ফলাফল জানার পরও নিজের অনুভূতি প্রকাশ করেন এভাবে, “এখনো মনে হয় যেন একটা ঘোরের মধ্যে আছি।”
শিক্ষাজীবন
হলি ক্রস গার্লস হাই স্কুল থেকে জিপিএ ৫ পেয়ে এসএসসি এবং হলি ক্রস কলেজ থেকে বিজ্ঞান বিভাগে একই ফলাফলে এইচএসসি সম্পন্ন করেন নিশাত। এরপর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও প্রাণহানি হ্রাস গবেষণা ইনস্টিটিউটে ভর্তি হন, যেখান থেকে সিজিপিএ ৩.৮৭ নিয়ে স্নাতক শেষ করেন এবং মেধাবৃত্তি অর্জন করেন। পরে একই বিষয়ে ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সিজিপিএ ৩.৭৮ নিয়ে স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করেন তিনি। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনার এই একাডেমিক পটভূমিই পরবর্তীতে তাঁর ভাইভার প্রশ্নে সরাসরি গুরুত্ব পায়।
একটিমাত্র সুযোগ, সর্বোচ্চ প্রস্তুতি
জীবনে একবারই বিসিএস দেবেন, এই সিদ্ধান্ত নিশাতের প্রস্তুতির পুরো দর্শনকে বদলে দেয়। একটি বিসিএসই দেওয়ার পরিকল্পনা তাঁর প্রস্তুতিকে একটি নির্দিষ্ট লক্ষ্য ও সময়সীমার মধ্যে গুছিয়ে নিতে সহায়তা করে।
প্রিলিমিনারি ও লিখিত প্রস্তুতির কৌশল
প্রিলিমিনারির জন্য হাতে ছিল তিন মাস, লিখিত পরীক্ষার জন্যও প্রায় তিন মাস সময় পান তিনি। প্রচলিত বিসিএস গাইডের পাশাপাশি নিয়মিত জাতীয় দৈনিক পড়তেন, কারেন্ট অ্যাফেয়ার্সের বিভিন্ন প্ল্যাটফর্ম অনুসরণ করতেন এবং অসংখ্য মডেল টেস্ট দেন, যা প্রিলিমিনারিতে বিশেষভাবে কাজে লাগে বলে মনে করেন তিনি। পড়ার সময়ই হাতে লিখে অনুশীলন করতেন, সময় বেশি লাগলেও এতে তথ্য দীর্ঘ সময় মনে থাকত বলে জানান তিনি। লিখিত পরীক্ষার জন্য ২০০ নম্বরের বিষয়গুলোকে অগ্রাধিকার দেন। আন্তর্জাতিক বিষয়াবলিতে বিশেষ আগ্রহ থাকায় একাধিক পত্রিকা মিলিয়ে বিস্তারিত নোট তৈরি করতেন, যা পরবর্তীতে বাংলা ও ইংরেজি রচনায় তথ্যসমৃদ্ধ উত্তর লিখতে সহায়তা করে। বাংলা, বাংলাদেশ বিষয়াবলি, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক ও বিজ্ঞান অংশে বুলেট পয়েন্ট আকারে উত্তর লিখে নির্ধারিত সময়ের ১০-১৫ মিনিট আগেই শেষ করতেন, যাতে ঝালিয়ে দেখার সময় পাওয়া যায়। গণিতে অনুশীলনের কোনো বিকল্প নেই বলে মনে করেন তিনি, আর অনুবাদে দক্ষতার জন্য বাংলা-ইংরেজি উভয় পত্রিকা নিয়মিত পড়াকে অপরিহার্য বলে উল্লেখ করেন।
ভাইভা: আলোচনার মতো এক অভিজ্ঞতা
প্রায় বিশ মিনিটের ভাইভা মূলত ইংরেজিতে হয়েছিল। প্রত্যাশার বিপরীতে ক্যাডারভিত্তিক প্রশ্ন তুলনামূলক কম আসে, বরং বোর্ডের মূল আগ্রহ ছিল তাঁর স্নাতকের বিষয় দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা নিয়ে। কার্বন ক্রেডিট, কপ-২৬ জলবায়ু সম্মেলন, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় বাংলাদেশের অবস্থান, রোহিঙ্গা সংকট, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ ও আইএমএফ ঋণের প্রভাবের মতো বিষয়ে প্রশ্ন করা হয় তাঁকে। পুরো ভাইভাটি জেরার চেয়ে একটি আলোচনার মতো মনে হয়েছিল তাঁর কাছে, বোর্ডের সদস্যরা নিজেদের মতামতও শেয়ার করেছেন এবং তাঁর মতামত জানতে চেয়েছেন। শুরুতে নার্ভাস থাকলেও ধীরে ধীরে আত্মবিশ্বাসী হয়ে ওঠেন তিনি। কোনো প্রশ্নের উত্তর না জানলে অনুমাননির্ভর উত্তর না দিয়ে বিনয়ের সঙ্গে তা স্বীকার করেছেন।
Learnera.xyz-এর ব্যবহারিক শিক্ষা
- লক্ষ্য ও সময়সীমা আগে থেকে ঠিক করে প্রস্তুতিকে ছোট ধাপে ভাগ করে নিন।
- পড়ার সময়ই লিখে অনুশীলন করুন, এতে তথ্য দীর্ঘ সময় মনে থাকে।
- নিজের একাডেমিক পটভূমি সংশ্লিষ্ট বিষয়ে ভাইভায় গভীর প্রশ্ন হতে পারে, তার জন্য আলাদা প্রস্তুতি রাখুন।
- নির্ধারিত সময়ের আগেই লিখে শেষ করার অভ্যাস গড়ুন, যাতে ঝালিয়ে দেখার সময় পাওয়া যায়।
- আন্তর্জাতিক বিষয়াবলিতে একাধিক সূত্র মিলিয়ে নোট তৈরি করুন, রচনার মান বাড়বে।
- না জানা প্রশ্নে অনুমান না করে বিনয়ের সঙ্গে অজ্ঞতা স্বীকার করুন।
ভাইভার দিনের সার্বিক পরিবেশ, বোর্ডের গঠন ও অপেক্ষার সময়টা নিয়ে বিস্তারিত জানতে পড়ুন Learnera.xyz-এর বিসিএস ভাইভার পরিবেশ নিয়ে সার্বিক গাইড।
আপনার প্রস্তুতিতে প্রয়োগ করুন
প্রিলিমিনারি ও লিখিত, দুই ধাপের জন্যই নিশাত তিন মাস করে সময় পেয়েছিলেন। নিয়মিত মডেল টেস্ট, লিখে অনুশীলন এবং একাধিক পত্রিকা মিলিয়ে নোট তৈরিকে নিজের পরিকল্পনায় রাখুন। শুরু করতে Learnera.xyz-এর বিগত পরীক্ষার প্রশ্ন এবং স্টাডি গাইড ব্যবহার করতে পারেন।