ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগে পড়া এস এম খালেদ চৌধুরী ৪১তম বিসিএসে সহকারী হিসাব মহানিয়ন্ত্রক (নিরীক্ষা ও হিসাব ক্যাডার) পদে সুপারিশপ্রাপ্ত হন। তাঁর ভাইভা ছিল প্রায় তেইশ থেকে চব্বিশ মিনিটের, যার প্রায় চল্লিশ শতাংশ ইংরেজিতে। একজন সভাপতি ও দুজন বহিরাগত পরীক্ষকের বোর্ডে ইতিহাস, রাজনীতি, সংগীত ও আন্তর্জাতিক সম্পর্ক নিয়ে বিস্তৃত ও অনেকটাই অপ্রত্যাশিত প্রশ্নের মুখোমুখি হন তিনি।
মুজিবনগর সরকার থেকে কুর্দি সমস্যা
বেল বাজার পর দরজা ঠেলে অনুমতি চেয়ে কক্ষে ঢোকেন খালেদ, বোর্ডকে সালাম ও ধন্যবাদ জানিয়ে আমন্ত্রণ পেয়ে বসেন। আনুষ্ঠানিক প্রশ্নের আগে সভাপতি নিজে থেকেই তাঁর জেলা, বিভাগ ও পছন্দক্রম নিয়ে টুকটাক কথা বলেন, প্রতিটিতেই সম্মতিসূচক উত্তর দেন খালেদ। এরপর নিজের বিশ্ববিদ্যালয়কে কেন্দ্র করে পরিচয় দিতে বলে শুরু হয় মূল প্রশ্নপর্ব, চল্লিশ-পঞ্চাশ সেকেন্ডে নিজের পরিচয় দেন খালেদ। মুজিবনগর সরকার গঠন নিয়ে জিজ্ঞাসায় ১৯৭১ সালের ১০ এপ্রিল তারিখ, ১৭ এপ্রিল স্থান ও বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের কথা বলার পর তাজউদ্দীন আহমদকে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে উল্লেখ করেন, তখনই প্রশ্ন আসে প্রতিরক্ষামন্ত্রী কে ছিলেন, তিনি উত্তর দেন তাজউদ্দীন আহমদই সেই দায়িত্বেও ছিলেন। কুর্দি সমস্যা নিয়ে বিস্তারিত জানতে চাইলে প্রথম বিশ্বযুদ্ধ থেকে শুরু করতেই তাঁকে থামিয়ে কুর্দিরা কোথায় বাস করে জিজ্ঞাসা করা হয়, তিনি সিরিয়া, ইরান, ইরাক, তুরস্কের নাম বলার পর কয়েক সেকেন্ড থেমে আর্মেনিয়ার নামও যোগ করেন, এই নির্ভুল তালিকায় সন্তুষ্ট হন সভাপতি। কুর্দিরা কোথায় সবচেয়ে ভালো আছে জিজ্ঞাসায় ইরাকি কুর্দিস্তানে তাদের স্বায়ত্তশাসন থাকার কথা বলেন, যা সভাপতির প্রত্যাশিত উত্তর ছিল বলে মনে হয়েছিল তাঁর কাছে।
সোহরাওয়ার্দী থেকে গানের প্রশ্ন
শহীদ সোহরাওয়ার্দীর বিভিন্ন ভূমিকা, ভারত ও পাকিস্তানে তাঁর অবদান এবং বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে সম্পর্ক নিয়ে আলোচনার পর তিনি কোন শহরের মেয়র ছিলেন জিজ্ঞাসায় কলকাতার নাম বলেন খালেদ। তাঁর নাগরিকত্ব নিয়ে জিজ্ঞাসায় প্রথমে অবিভক্ত ভারতের নাগরিক এবং দেশভাগের পর পাকিস্তানে ফিরে যাওয়ার কথা বলেন, পশ্চিমবঙ্গের ঠিক কোন অঞ্চলের তা জিজ্ঞাসায় চব্বিশ পরগনা আর মালদহের মধ্যে দ্বিধায় পড়ে বিনয়ের সঙ্গে অনিশ্চয়তা স্বীকার করেন। সোহরাওয়ার্দীর বাবার নাম জিজ্ঞাসায় এটিকে অপ্রত্যাশিত মনে করে দুঃখ প্রকাশ করেন তিনি, সভাপতি তখন বলেন, জেনে রাখা উচিত, তিনি একজন জাতীয় নেতা, তাঁর সম্পর্কে জানা উচিত আমাদের, খালেদ বিষয়টি জেনে নেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেন। এরপর হঠাৎ গান শোনেন কি না জিজ্ঞাসায় হ্যাঁ বললে ধ্রুপদি না আধুনিক জিজ্ঞাসা করা হয়, ধ্রুপদি বেছে নিলে কার গান শোনেন জিজ্ঞাসায় রবীন্দ্রনাথ ও এস ডি বর্মণের নাম বলেন। এস ডি বর্মণের একটি গানের পূর্ণ কথা মনে করতে না পারলেও আংশিকভাবে “প্রেম করেছি আমি” স্মরণ করতে পারেন, যা শুনে হেসে ফেলেন সভাপতি। তাঁর বিখ্যাত সংগীতশিল্পী ছেলের নাম জিজ্ঞাসায় আর ডি বর্মণের নাম বললেও পুরো নাম বা গান মনে করতে না পেরে আবারও দুঃখ প্রকাশ করেন, সভাপতি আশ্বস্ত করে বলেন, খালেদ, সবকিছু জানার দরকার নেই।
মিয়ানমারকে নতুন করে পরিচয় করানোর চ্যালেঞ্জ
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হওয়া একটি অশ্লীল গান শুনেছেন কি না জিজ্ঞাসায় শোনেননি জানিয়ে ইদানীং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বেশি সময় দেন না বলে জানান, ভাইভার প্রস্তুতির কারণেই কি না জিজ্ঞাসায় সম্মতি জানান এবং বঙ্গবন্ধুর বইপত্র পড়ছেন বলে জানান। মধ্যপ্রাচ্য কী এবং কেন একে “মধ্যপ্রাচ্য” বলা হয় জিজ্ঞাসায় ভৌগোলিক তথ্য দিতে পারলেও নামকরণের কারণ স্পষ্টভাবে না জানার কথা স্বীকার করেন। সবচেয়ে অস্বাভাবিক প্রশ্নটি আসে মিয়ানমার নিয়ে, সভাপতি বলেন, ধরে নিন আমরা মিয়ানমার সম্পর্কে কিছুই জানি না, এর অবস্থান, রাজনীতি, ইতিহাস সবকিছু নিয়ে সংক্ষিপ্ত পরিচিতি দিন। অনুমতি নিয়ে ভৌগোলিক অবস্থান, ১৯৪৮ সালের স্বাধীনতা ও ১৯৬২ সালে জেনারেল নে উইনের সামরিক অভ্যুত্থান পর্যন্ত বলার পরই সভাপতি থামিয়ে বলেন, ঠিক আছে, এদিকে আসুন, এবং দ্বিতীয় বহিরাগত পরীক্ষকের কাছ থেকে কাগজপত্র চেয়ে নেন। বহিরাগত পরীক্ষকদের প্রশ্নে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক ও আন্তর্জাতিক বিপণনের পার্থক্য, বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতিতে ভারসাম্য রক্ষার ধারণা, ভূরাজনীতির সংজ্ঞা এবং ভারত ও চীনের কাছে বাংলাদেশের গুরুত্ব নিয়ে বিস্তারিত প্রশ্ন হয়।
না জানাকে জটিল না করে তোলা
নিজে দ্রুত কথা বলেন বলে জানান খালেদ, যা হয়তো বোর্ডকে আরও বেশি প্রশ্ন করার সুযোগ করে দিয়েছিল। তবে পুরো ভাইভাজুড়ে আত্মবিশ্বাস ও সাবলীলতা ধরে রাখেন তিনি। কোনো প্রশ্নের উত্তর না জানলে জটিল ব্যাখ্যায় না গিয়ে বিনয়ের সঙ্গে কয়েকবার তা স্বীকার করেছেন। একটি উত্তরের পর সভাপতি তাঁকে আশ্বস্তও করেছিলেন, সবকিছু জানার দরকার নেই। এটি ছিল খালেদের জীবনের প্রথম চাকরির সাক্ষাৎকার, আবার এই সভাপতির নেতৃত্বাধীন বোর্ডেরও প্রথম দিনের ভাইভা ছিল এটি। প্রশ্নপর্ব শেষে সভাপতি তাঁকে দ্বিতীয় বহিরাগত পরীক্ষকের কাছ থেকে নিজের কাগজপত্র সংগ্রহ করতে বলেন, এরপর সবাইকে ধন্যবাদ ও সালাম জানিয়ে কক্ষ ত্যাগ করেন তিনি।
Learnera.xyz-এর ব্যবহারিক শিক্ষা
- নিজের পঠিত বিষয় সংশ্লিষ্ট আন্তর্জাতিক ইস্যুতে গভীর প্রস্তুতি রাখুন।
- ইংরেজিতেও সাবলীলভাবে উত্তর দেওয়ার অনুশীলন করুন।
- ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্ব ও তাঁদের পারিবারিক পরিচয় পর্যন্ত জেনে রাখুন।
- বোর্ড হঠাৎ অপ্রচলিত প্রশ্ন করতে পারে, ভড়কে না গিয়ে স্থিরভাবে উত্তর সাজানোর অনুশীলন করুন।
- যেকোনো দেশ বা বিষয়ের সংক্ষিপ্ত পরিচিতি দ্রুত গুছিয়ে বলার অভ্যাস তৈরি করুন।
- না জানা প্রশ্নে সততার সঙ্গে তা স্বীকার করা আত্মবিশ্বাসের লক্ষণ হিসেবে বিবেচিত হয়।
বোর্ডের গঠন ও কথোপকথনের ধরন নিয়ে আরও বিস্তারিত জানতে পড়ুন Learnera.xyz-এর বিসিএস ভাইভার পরিবেশ নিয়ে সার্বিক গাইড।
আপনার প্রস্তুতিতে প্রয়োগ করুন
নিজের বিভাগ সংশ্লিষ্ট আন্তর্জাতিক বিষয়ে গভীর প্রস্তুতি ভাইভায় স্বতন্ত্র সুবিধা এনে দেয়। শুরু করতে Learnera.xyz-এর বিগত পরীক্ষার প্রশ্ন এবং স্টাডি গাইড ব্যবহার করতে পারেন। খালেদের অভিজ্ঞতা মনে করিয়ে দেয়, সততা ও সাবলীলতা একসঙ্গে ভালো প্রভাব ফেলে।