বাবাকে হারানোর ধাক্কা সামলে ঠিক দুই বছর পর বিসিএসে সাফল্য পেলেন বরিশালের ছেলে আশরাফুল ইসলাম ইমন। বাংলাদেশ টেক্সটাইল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুটেক্স) এই শিক্ষার্থী ৪৩তম বিসিএস পরীক্ষায় তথ্য ক্যাডারে সুপারিশ পেয়েছেন, অথচ এর আগে ৪১তম বিসিএসের রিটেন পরীক্ষার মাত্র দুই মাস আগে বাবাকে হারিয়ে মানসিকভাবে পুরোপুরি ভেঙে পড়েছিলেন তিনি। পরিবার ও আত্মীয়স্বজনের মধ্যে ইমনই প্রথম বিসিএস ক্যাডার কর্মকর্তা।
এক নজরে ইমনের গল্প
- বরিশালের আশরাফুল ইসলাম ইমন ৪৩তম বিসিএস পরীক্ষায় তথ্য ক্যাডারে সুপারিশ পেয়েছেন
- ৪১তম বিসিএসের রিটেন পরীক্ষার দুই মাস আগে, ২০২১ সালের ২ অক্টোবর বাবাকে হারান তিনি
- বাবার মৃত্যুর ধাক্কায় সেই পরীক্ষায় ক্যাডার পদে সুপারিশ পাননি, পেয়েছিলেন প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক পদে নন-ক্যাডার সুপারিশ
- বাংলাদেশ টেক্সটাইল বিশ্ববিদ্যালয়ের ৪১তম ব্যাচের শিক্ষার্থী ইমন, পড়াশোনা করেছেন বরিশাল জিলা স্কুল ও সৈয়দ হাতেম আলী কলেজে
- প্রায় এক বছরের মানসিক টানাপোড়েন কাটিয়ে নিজেকে গুছিয়ে ৪৩তম বিসিএসে সাফল্য পান, ফল ঘোষণা হয় ২৬ ডিসেম্বর
শিক্ষাজীবন ও পারিবারিক পটভূমি
বরিশাল জিলা স্কুল থেকে মাধ্যমিক আর শহরের সৈয়দ হাতেম আলী কলেজ থেকে উচ্চ মাধ্যমিক শেষ করে ইমন ২০১৪-১৫ সেশনে ভর্তি হন বাংলাদেশ টেক্সটাইল বিশ্ববিদ্যালয়ে (বুটেক্স), বিশ্ববিদ্যালয়টির ৪১তম ব্যাচের শিক্ষার্থী হিসেবে। তার বাবা আলি ইসলাম মোল্লা ছিলেন রুপালি ব্যাংকের একজন কর্মকর্তা। তিন ভাইবোনের মধ্যে ইমনের চেয়ে পাঁচ বছরের বড় এক বোন আছে, আর ছোট ভাই আহসানুল্লাহ্ পড়াশোনা করছেন আহছানউল্লাহ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগে। পরিবারের কারো আগে সরকারি প্রশাসনে যুক্ত হওয়ার অভিজ্ঞতা ছিল না, বুটেক্সের শেষ বর্ষে থাকা অবস্থায় পরিবারকে সম্মানিত করা আর স্বস্তির একটি কর্মজীবন গড়ার তাগিদ থেকেই ইমন বিসিএসের দিকে ঝুঁকেছিলেন, বাবা-মায়ের উৎসাহও ছিল সে পথে।
রিটেন পরীক্ষার দুই মাস আগে বাবাকে হারানো
৪১তম বিসিএসের প্রস্তুতি যখন তুঙ্গে, ঠিক তখনই ২০২১ সালের ২ অক্টোবর হঠাৎ মারা যান ইমনের বাবা, রিটেন পরীক্ষার মাত্র দুই মাস আগে। দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে ইমন বলেন, “বাবার মত কেউ আমাকে এতটা আগলে রাখেনি, ভালোবাসে নি।” সেই আকস্মিক মৃত্যুর ধাক্কা সামলে নেওয়া তার পক্ষে সহজ ছিল না, প্রস্তুতিহীন আর মানসিকভাবে বিধ্বস্ত অবস্থাতেই তিনি সেবার রিটেন পরীক্ষায় বসেন। নিজের অভিজ্ঞতা বর্ণনা করতে গিয়ে তিনি বলেন, “আমার ঐ রিটেন পরীক্ষার খাতায় শুধু কলমের কালি নয়, চোখের জলও ছিলো।” স্বাভাবিকভাবেই সেই পরীক্ষায় ক্যাডার পদে সুপারিশ পাননি ইমন, ৪১তম বিসিএসের ফলাফলে তাকে সুপারিশ করা হয় নন-ক্যাডার পদে, প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক হিসেবে।
এক বছরের মানসিক লড়াই আর ঘুরে দাঁড়ানো
৪১তম বিসিএসের রিটেনের ছয় মাস পর, ২০২২ সালের জুনে ৪৩তম বিসিএসের রিটেন পরীক্ষা হয়। কিন্তু বাবাকে হারানোর শোক থেকে বের হতে ইমনের সময় লেগেছিল প্রায় এক বছর। বই সামনে নিয়ে বসলেও পড়ায় মন বসত না, বাবার শেষ মুহূর্তের স্মৃতি আর অ্যাম্বুলেন্সের দৃশ্য বারবার মনোযোগ ভেঙে দিত। এই সময়ে তিনি আরও কিছু সরকারি চাকরির পরীক্ষায় অংশ নিয়ে একাধিকবার ভাইভা পর্যন্ত পৌঁছান, কিন্তু শেষ পর্যন্ত কোনোটাতেই চূড়ান্তভাবে উত্তীর্ণ হননি। পরিবারের বড় ছেলে হিসেবে সামাজিক দায়িত্ববোধ থেকে তিনি নিজেকে নতুন করে গুছিয়ে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন, প্রতিদিন নতুন লক্ষ্য ঠিক করে নিজেকে নতুনভাবে তৈরি করতে থাকেন। বাবার মৃত্যুর পর মা ও পরিবারের কষ্ট দেখেই তার মধ্যে জেদ তৈরি হয়, তিনি নিজের জন্য নয় বরং পরিবারের জন্যই লড়াই চালিয়ে যান।
ভাইভা, ফল ঘোষণা আর পরিবারের প্রথম ক্যাডার কর্মকর্তা
২০২৩ সালের অক্টোবরে ৪৩তম বিসিএসের ভাইভা দেন ইমন, তবে ভাইভা শেষে নিজের সম্ভাবনা নিয়ে তেমন আত্মবিশ্বাসী ছিলেন না তিনি, রিটেনের প্রস্তুতি পর্যাপ্ত হয়নি বলেই মনে হচ্ছিল তার কাছে। গত ২৬ ডিসেম্বর ৪৩তম বিসিএসের চূড়ান্ত ফল প্রকাশ করে সরকারি কর্ম কমিশন (পিএসসি), যেখানে ক্যাডার ও নন-ক্যাডার মিলিয়ে মোট ২ হাজার ৮০৫ জন সুপারিশপ্রাপ্ত হন। সেই তালিকায় নিজের নাম দেখে রীতিমতো বিস্মিত হন ইমন, তথ্য ক্যাডারে সুপারিশ পাওয়ার খবরে মা খুশিতে ভেঙে পড়েন, পরিবার ফিরে পায় নতুন শক্তি। পরিবার ও আত্মীয়স্বজনের মধ্যে ইমনই প্রথম বিসিএস ক্যাডার কর্মকর্তা হলেন, তার এই সাফল্য দেখে তার মতোই সাধারণ পরিবার থেকে আসা আরও অনেকে নতুন করে সাহস পাবেন বলে মনে করেন তিনি।
ক্রিকেট আর সমাজসেবায় সক্রিয় ছিলেন ইমন
পড়াশোনার বাইরে ক্রিকেট ছিল ইমনের বড় ভালোবাসার জায়গা, কলেজ জীবনে এই খেলা থেকে বেশ কিছু ট্রফিও জিতেছেন তিনি। বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে বিভিন্ন সামাজিক ও স্বেচ্ছাসেবী কাজেও নিয়মিত যুক্ত ছিলেন ইমন, দরিদ্র ও অসহায় মানুষকে সহায়তা করা, পথশিশুদের মধ্যে ঈদের পোশাক বিতরণ, শীতার্তদের কম্বল দেওয়া, করোনাকালে মাস্ক ও ত্রাণ বিতরণ, বৃক্ষরোপণ এবং মাদক ও যৌতুকবিরোধী সচেতনতামূলক কর্মসূচিতে অংশ নিয়েছেন তিনি। কৃতজ্ঞতা জানিয়ে ইমন বলেন, “যেখানে আল্লাহ্ সুযোগ দেবেন দেশ, জনগণ ও সোসাইটির জন্য নিষ্ঠার সাথে কাজ করবো ইনশাআল্লাহ্।”
ইমনের গল্প থেকে যা শেখার
- প্রিয়জন হারানোর মতো ব্যক্তিগত সংকটেও প্রস্তুতি পুরোপুরি থেমে না রেখে, সময় নিয়ে হলেও নিজেকে আবার গুছিয়ে নেওয়া সম্ভব।
- একটি বিসিএসে ক্যাডার না পেয়ে নন-ক্যাডার সুপারিশ পাওয়ার পরও পরের চেষ্টায় লক্ষ্যে অটল থাকা যায়।
- মানসিক স্বাস্থ্যের সংকট স্বীকার করে নেওয়া আর প্রয়োজনে সময় নেওয়া দুর্বলতা নয়, বরং দীর্ঘমেয়াদী প্রস্তুতিরই একটি অংশ।
- পরিবারের প্রতি দায়িত্ববোধ অনেক সময় সবচেয়ে বড় প্রেরণা হয়ে উঠতে পারে, বিশেষত সবচেয়ে কঠিন সময়ে।
- একাধিক সরকারি চাকরির পরীক্ষায় ভাইভা পর্যন্ত পৌঁছেও ব্যর্থ হওয়া একটি স্বাভাবিক ধাপ হতে পারে, চূড়ান্ত ব্যর্থতা নয়।
- পরিবারে প্রথম বিসিএস ক্যাডার কর্মকর্তা হওয়ার মতো অর্জন সমাজের আরও অনেকের জন্য অনুপ্রেরণা হয়ে উঠতে পারে।
এরপর কী করবেন
ইমনের মতো ব্যক্তিগত সংকট সামলেও বিসিএসের প্রস্তুতি চালিয়ে যেতে চাইলে আজই ঘুরে আসুন Learnera.xyz-এর previous questions আর্কাইভ-এ, যেখানে বিভিন্ন বিসিএস ক্যাডার ও বিষয়ের প্রশ্ন খুঁজে নিজের প্রস্তুতি যাচাই করা যায়। সঙ্গে Study Guides-এ পাবেন সিলেবাসভিত্তিক পড়ার উপকরণ ও সংশ্লিষ্ট প্র্যাকটিস প্রশ্ন। কঠিন সময়ে থেমে না গিয়ে ধারাবাহিক অনুশীলন চালিয়ে গেলে সাফল্য একদিন আসবেই, আজই একটি বিষয় বেছে নিয়ে অনুশীলন শুরু করুন।