ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের শিক্ষার্থী ইসমাইল হোসেন রিদয় ৪৭তম বিসিএসে প্রথম প্রচেষ্টাতেই শিক্ষা ক্যাডারে সুপারিশপ্রাপ্ত হয়েছেন। বিসিএসের ইতিহাসের অন্যতম প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ এই ব্যাচে প্রিলিমিনারি ও লিখিত, দুই ধাপই প্রথমবারে পার করার অভিজ্ঞতাকে তিনি নিজেই “স্বপ্নের মতো” বলে বর্ণনা করেছেন। তার প্রস্তুতির কেন্দ্রে ছিল একটিই সহজ কিন্তু কঠোর অভ্যাস, একই বিষয় বারবার লিখে অনুশীলন করা।
এক নজরে রিদয়ের প্রস্তুতির কৌশল
- ৪৭তম বিসিএসে প্রথম প্রচেষ্টাতেই শিক্ষা ক্যাডারে সুপারিশপ্রাপ্ত
- পড়ার পাশাপাশি একই বিষয় ১০ থেকে ১৫ বার পর্যন্ত লিখে অনুশীলন করা প্রধান কৌশল
- এসএসসিতে জিপিএ ৪.৯৪, এইচএসসিতে জিপিএ ৫.০, স্নাতকে সিজিপিএ ৩.৬ ও স্নাতকোত্তরে সিজিপিএ ৩.৫
- ক্যাডার পছন্দক্রমে শিক্ষা ছিল তৃতীয় পছন্দ, তবু সেই ক্যাডারেই সুপারিশ পেয়েছেন
- বিসিএসকে একমাত্র লক্ষ্য না বানিয়ে বিকল্প প্রস্তুতি রাখার পরামর্শ দিয়েছেন
পরিবার ও শিক্ষাজীবনের ভিত
রিদয় পরিবারের একমাত্র ছেলে, তার চার বোনই স্নাতক সম্পন্ন করেছেন এবং তাদের মধ্যে তিনজন এখন কর্মরত। বাবা বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর একজন সাধারণ সৈনিক ছিলেন, মা গৃহিণী। পরিবারের প্রত্যাশা এবং বোনদের অর্জন তাকে নিজের জায়গা থেকে কিছু করে দেখানোর তাগিদ দিয়েছিল বলে তিনি জানিয়েছেন।
তার শিক্ষাজীবনের শুরু গ্রামের একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। এরপর উপজেলা পর্যায়ের একটি স্বনামধন্য বিদ্যালয় থেকে জুনিয়র স্কুল সার্টিফিকেট পরীক্ষায় উপজেলা পর্যায়ে প্রথম স্থান অর্জন করেন। মাধ্যমিক স্তরে সরকারি যদুনাথ পাইলট মডেল স্কুল অ্যান্ড কলেজে বিজ্ঞান বিভাগে ভর্তি হয়ে এসএসসিতে জিপিএ ৪.৯৪ পান, আর উচ্চ মাধ্যমিকে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় স্কুল অ্যান্ড কলেজ থেকে জিপিএ ৫.০ অর্জন করেন। পরে ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগে ২০১৭-১৮ শিক্ষাবর্ষে ভর্তি হয়ে স্নাতকে সিজিপিএ ৩.৬ এবং ২০২১-২২ শিক্ষাবর্ষে স্নাতকোত্তরে সিজিপিএ ৩.৫ নিয়ে পড়াশোনা শেষ করেন। প্রতিটি ধাপেই ধারাবাহিক ভালো ফলাফল তার পরবর্তী প্রস্তুতির ভিত তৈরি করে দেয়।
শুধু পড়া নয়, বারবার লেখাই ছিল মূলমন্ত্র
রিদয়ের নিজের ভাষায়, শুধু পড়ে যাওয়াই তার প্রস্তুতির পুরো গল্প নয়। তিনি একই বিষয় বহুবার লিখে অনুশীলন করাকে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কৌশল হিসেবে দেখেন, কোনো কোনো বিষয় তিনি ১০ থেকে ১৫ বার পর্যন্ত লিখেছেন। বারবার লেখার এই অভ্যাস তথ্য মনে রাখার পাশাপাশি লিখিত পরীক্ষার জন্য হাত ও মস্তিষ্ককে প্রস্তুত রাখতে সাহায্য করেছে বলে তিনি মনে করেন।
প্রস্তুতির দীর্ঘ সময়ে হতাশার মুহূর্তও কম আসেনি। এমন সময় গেছে যখন তিনি নিজেই ভেবেছেন, পারবেন কিনা। তবে প্রতিবারই সেই হতাশা পেছনে ফেলে নতুন উদ্যমে আবার পড়ায় ফিরেছেন। পড়াশোনার পাশাপাশি স্রষ্টার প্রতি অবিচল আস্থাকে তিনি মানসিক জোর ও স্থিরতার একটি বড় জায়গা বলে উল্লেখ করেছেন। সাফল্যের অনুভূতি নিয়ে তিনি বলেন, “এই সাফল্যের অনুভূতি এখনও আমার কাছে অবিশ্বাস্য। প্রথমবারেই বিসিএসের ইতিহাসের অন্যতম কঠিন প্রিলি ও লিখিত পরীক্ষা পেরিয়ে ক্যাডার হব এটা কখনো ভাবিনি। আলহামদুলিল্লাহ, সব কিছুর জন্য সৃষ্টিকর্তার কাছে কৃতজ্ঞ।”
ক্যাডার পছন্দ এবং সততা ধরে রাখার তাগিদ
পছন্দক্রম সাজানোর সময় রিদয়ের প্রথম পছন্দ ছিল প্রশাসন ক্যাডার, এরপর ট্যাক্স এবং তৃতীয় স্থানে ছিল সাধারণ শিক্ষা ক্যাডার। শেষ পর্যন্ত তিনি সুপারিশ পেয়েছেন তার তৃতীয় পছন্দ, শিক্ষা ক্যাডারেই, প্রথম প্রচেষ্টাতেই। এই অভিজ্ঞতা থেকে তিনি ভবিষ্যৎ পরীক্ষার্থীদের ক্যাডার পছন্দের ক্ষেত্রে তিনটি বিষয় বিবেচনা করার পরামর্শ দেন, নিজের স্বভাবের সঙ্গে মানানসই কর্মপরিবেশ, সততা বজায় রাখার সুযোগ, এবং অতিরিক্ত চাপ ছাড়া কাজের পরিবেশ। তার ভাষায়, “যে জায়গায় নিজেকে সৎ রাখতে পারবেন, চাপ কম অনুভব করবেন এবং নিজের সঙ্গে মানিয়ে নিতে পারবেন সেই ক্যাডারই বেছে নেওয়া উচিত।”
প্রস্তুতির সামগ্রিক দর্শন হিসেবে তিনি সততা, অন্যের সঙ্গে ভালো আচরণ, নিয়মিত ধর্মীয় অনুশাসন পালন, স্রষ্টার ওপর ভরসা এবং পড়াশোনায় মনোযোগকে একসঙ্গে জুড়ে দেন, “সৎ থাকুন, কারও সঙ্গে খারাপ আচরণ করবেন না, নিজের ধর্ম যথাযথভাবে পালন করুন, সৃষ্টিকর্তার ওপর ভরসা রাখুন এবং প্রচুর পড়াশোনা করুন।”
বিসিএসই একমাত্র পথ নয়, বিকল্প প্রস্তুতির পরামর্শ
রিদয় বিসিএসকে জীবনের একমাত্র লক্ষ্য বানিয়ে ফেলার প্রবণতার সঙ্গে একমত নন। তিনি মনে করিয়ে দেন, ক্যাডার পদের সংখ্যা সীমিত হলেও প্রতিযোগীর সংখ্যা অনেক বেশি, তাই একটি পরীক্ষার ওপর পুরোপুরি নির্ভর না করে নিজের যোগ্যতা অনুযায়ী অন্য পেশাগত খাতেও প্রস্তুতি ও সুযোগ যাচাই করে রাখা উচিত। ভবিষ্যৎ নিয়ে তিনি বলেন, “আমি পরিবর্তনে বিশ্বাসী। সুযোগ পেলে দেশের জন্য ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে চাই। শুধু বাহ্যিক নয়, মানুষের আত্মিক ও সামাজিক পরিবর্তনও দেখতে চাই।”
রিদয়ের অভিজ্ঞতা থেকে যা শেখার
- শুধু পড়ার ওপর নির্ভর না করে একই বিষয় বারবার লিখে অনুশীলন করুন, এতে তথ্য মনে থাকে এবং লিখিত পরীক্ষার জন্য হাত তৈরি থাকে।
- হতাশার মুহূর্ত এলে থেমে না গিয়ে দ্রুত আবার প্রস্তুতিতে ফেরার অভ্যাস গড়ে তুলুন।
- ক্যাডার পছন্দক্রম সাজানোর সময় শুধু র্যাংকিং নয়, নিজের স্বভাব ও সততা বজায় রাখার সুযোগও বিবেচনা করুন।
- প্রথম পছন্দ না পেলেও হতাশ না হয়ে পরের পছন্দের ক্যাডারের জন্যও সমান আন্তরিকতায় প্রস্তুতি নিন।
- বিসিএসকে একমাত্র লক্ষ্য না বানিয়ে নিজের যোগ্যতা অনুযায়ী বিকল্প ক্যারিয়ার প্রস্তুতিও সমান্তরালে রাখুন।
- মানসিক স্থিরতার জন্য পড়াশোনার পাশাপাশি নিজের বিশ্বাস ও মূল্যবোধের জায়গাটাও অবহেলা করবেন না।
এরপর কী করবেন
রিদয়ের মতো বারবার লিখে অনুশীলনের কৌশল কাজে লাগাতে চাইলে শুরু করুন Learnera.xyz-এর previous questions আর্কাইভ থেকে, যেখানে বিষয়ভিত্তিক প্রশ্ন দেখে নিজের হাতে লিখে অনুশীলন করা যায়। পাশাপাশি Study Guides-এ সিলেবাসভিত্তিক পড়ার উপকরণ ও সংশ্লিষ্ট প্র্যাকটিস প্রশ্ন একসঙ্গে পাবেন। আজই একটি বিষয় বেছে নিয়ে সেটি নিজের হাতে লিখে অনুশীলন শুরু করুন, ধারাবাহিকতাই দীর্ঘমেয়াদে সবচেয়ে বড় পার্থক্য তৈরি করে।