বিসিএস ভাইভার প্রস্তুতি নেওয়ার সময় বেশির ভাগ প্রার্থীর মনোযোগ থাকে কোন প্রশ্ন আসতে পারে তার দিকে, কিন্তু বোর্ডকক্ষের বাইরে অপেক্ষা, ভেতরে ঢোকার মুহূর্ত আর বোর্ডের আচরণ, পুরো এই পরিবেশটাও একজন প্রার্থীর মানসিক প্রস্তুতিতে সমান গুরুত্বপূর্ণ। Learnera.xyz-এ ইতিমধ্যে প্রকাশিত বিভিন্ন ব্যাচের ভাইভা অভিজ্ঞতা এবং বাংলাদেশ সরকারি কর্ম কমিশনের (পিএসসি) নিজস্ব প্রকাশিত তথ্য মিলিয়ে এই লেখায় তুলে ধরা হলো, ভাইভার দিনটা আসলে কেমন যায়।
অপেক্ষার সময় ও ডাক পাওয়া
ভাইভা শুরুর আগে বোর্ডকক্ষের বাইরে অপেক্ষা করাটাই অনেকের কাছে সবচেয়ে উদ্বেগময় সময়। ৪১তম বিসিএসে বুয়েট থেকে পাস করা নিয়ামত আলী খান ছিলেন অপেক্ষারত প্রথম পাঁচ প্রার্থীর একজন, প্রতিটি প্রার্থীকে শুকনো মুখে বের হতে দেখে শুরুতে বেশ নার্ভাস হয়ে পড়েছিলেন তিনি, পরে আশপাশের প্রার্থীদের সঙ্গে টুকটাক কথা বলে সেই উদ্বেগ কাটিয়ে ওঠেন। অন্যদিকে মো. ফয়সালের অভিজ্ঞতা ছিল উল্টো, সেদিন সবার আগে ডাক পড়ায় তুলনা করার মতো কাউকে না পেয়ে অপেক্ষার পুরোটা সময় বেশ নার্ভাস কাটে তাঁর। সালাহ্ উদ্দিন কাদেরের কাছে আবার পুরো অপেক্ষাটাই স্বপ্নের মতো মনে হয়েছিল, তীব্র উত্তেজনা আর নার্ভাসনেস একসঙ্গে কাজ করছিল তাঁর মধ্যে। এই অভিজ্ঞতাগুলো একটি বিষয় স্পষ্ট করে, অন্য প্রার্থীর মুখ দেখে বোর্ডের মেজাজ আন্দাজ করার চেষ্টা একটি সাধারণ প্রবণতা, তবে তা নির্ভরযোগ্য কোনো ইঙ্গিত নয়।
বোর্ড ঠিক কেমন, ক’জন থাকেন
পিএসসির নিজস্ব তথ্য অনুযায়ী, ভাইভা বোর্ডে সাধারণত একজন সভাপতিসহ মোট তিনজন সদস্য থাকেন, নির্দিষ্ট কোনো সিলেবাস ছাড়াই প্রার্থীর একাডেমিক পড়াশোনা, দেশ-সমাজ-রাজনীতি, জাতীয়-আন্তর্জাতিক বিষয়াবলি, ব্যক্তিগত মূল্যবোধ ও দর্শন এবং ক্যাডার পছন্দ নিয়ে প্রশ্ন করা হয়। মো. ফয়সালের বোর্ডেও তিনজন সদস্য ছিলেন, আর এস এম খালেদ চৌধুরীর বোর্ডে ছিলেন একজন সভাপতি ও দুজন বহিরাগত পরীক্ষক। ভাইভার স্থায়িত্বও প্রার্থীভেদে ভিন্ন, শের শাহর ভাইভা ছিল মাত্র বারো মিনিটের প্রায় কুড়িটি প্রশ্নে, খালেদের ভাইভা চলে তেইশ থেকে চব্বিশ মিনিট, আর ফজলে রাব্বির ভাইভা গড়ায় পঁচিশ থেকে ত্রিশ মিনিট পর্যন্ত। অর্থাৎ ভাইভা দশ-বারো মিনিটেও শেষ হতে পারে, আবার আধা ঘণ্টা পর্যন্তও গড়াতে পারে, নির্দিষ্ট কোনো সময়সীমা নেই।
জেরা নয়, বেশির ভাগ সময় কথোপকথন
একাধিক প্রার্থীর বর্ণনায় বারবার উঠে এসেছে, ভাইভা বোর্ডের পরিবেশ কড়া জেরার চেয়ে অনেকটাই কথোপকথনের মতো। নিশাত বিনতে রায়হানের কাছে পুরো ভাইভাটি জেরার চেয়ে আলোচনার মতো মনে হয়েছিল, বোর্ডের সদস্যরা নিজেদের মতামতও শেয়ার করেছেন তাঁর সঙ্গে। আবীর হোসেন তাঁর ভাইভাকে বর্ণনা করেছেন জীবনের সবচেয়ে ভালো কথোপকথন বলে, বোর্ডের সদস্যদের সহযোগিতাপূর্ণ আচরণের কথা উল্লেখ করে। খালেদ চৌধুরীর অভিজ্ঞতায় আবার ভিন্ন একটি দিক দেখা যায়, এসডি বর্মণের একটি গানের কথা পুরোপুরি মনে করতে না পারলেও আংশিক স্মরণ করতে পারায় সভাপতি হেসে ফেলেন, আর তাঁর বিখ্যাত সংগীতশিল্পী ছেলে আর ডি বর্মণের পুরো নাম মনে করতে না পারলে সভাপতি নিজেই আশ্বস্ত করে বলেন, সবকিছু জানার দরকার নেই। তবে বোর্ড শুধু নরমই থাকে না, ভুল তথ্য দিলে তা যাচাই করার প্রশ্নও করে, যেমন সালাহ্ উদ্দিন কাদের পুলিশ পরিচালনার আইনের সাল ভুল বলার পরই বোর্ড পাল্টা প্রশ্নে তা যাচাই করে, আর তিনি নিজেই ভুল ধরে সঠিক তথ্য দিয়ে সংশোধন করে নেন। অর্থাৎ বোর্ডের আন্তরিকতা মানে কড়াকড়ির অভাব নয়, বরং একটি পেশাদার অথচ মানবিক পরিবেশ।
নার্ভাসনেস দরজার বাইরে থেকে যায়
পর্যালোচিত একাধিক অভিজ্ঞতায় একটি মিল দেখা যায়, দরজার বাইরে নার্ভাসনেস যতটা তীব্র থাকে, ভেতরে ঢোকার পর তা অনেকটাই স্তিমিত হয়ে যায়। আবীর হোসেন ভাইভা কক্ষে ঢোকার আগে স্বাভাবিকভাবেই নার্ভাস ছিলেন, তবে ভেতরে ঢোকার পরই সেই উদ্বেগ পুরোপুরি কেটে যায় বলে জানান তিনি। জাফর আহাম্মদের মধ্যেও ঢোকার আগে মিশ্র অনুভূতি কাজ করছিল, কিছুটা ভয়ের পাশাপাশি নিজের যোগ্যতা প্রমাণের আশাবাদও ছিল তাঁর মধ্যে, ভেতরে ঢোকার পর প্রশ্নের ধরন নিয়ে দুশ্চিন্তা কেটে গিয়ে হাসিমুখে স্থিরভাবে উত্তর দিতে পেরেছিলেন তিনি। নিশাতও শুরুতে নার্ভাস থাকলেও ধীরে ধীরে আত্মবিশ্বাসী হয়ে ওঠেন। এই প্যাটার্ন থেকে একটি ব্যবহারিক শিক্ষা পাওয়া যায়, বাইরে অপেক্ষার সময়কার উদ্বেগ ভাইভার প্রকৃত অভিজ্ঞতার নির্ভরযোগ্য পূর্বাভাস নয়।
সিরিয়াল নিয়ে দুশ্চিন্তার দরকার নেই
ভাইভার সিরিয়াল নিয়ে দুশ্চিন্তা অনেক প্রার্থীরই থাকে, তবে যাঁরা ইতিমধ্যে সফল হয়েছেন তাঁদের অভিজ্ঞতা ভিন্ন কথা বলে। চৌদ্দ প্রার্থীর মধ্যে দশম ক্রমে ভাইভা দেওয়া শের শাহ পরের দিকে ভাইভা দিলে কম নম্বর পাওয়ার প্রচলিত ধারণাকে ভুল বলে মনে করেন, তাঁর মতে পরীক্ষকেরা প্রার্থীর ব্যক্তিত্ব, সততা ও উপস্থিত বুদ্ধি যাচাই করেন, ক্রম যাই হোক না কেন। আনিসুর রহমানের অভিজ্ঞতা আবার উল্টো দিক থেকে একই সিদ্ধান্তে পৌঁছায়, সিরিয়াল প্রথম দিকে পাওয়ায় তিনি বরং স্বস্তি বোধ করেছিলেন, কারণ তাঁর ভাষায় আগে অন্য কোনো প্রার্থী খুব ভালো বা খুব খারাপ ভাইভা দিলে তা বোর্ডের মনে বাড়তি প্রত্যাশা তৈরি করতে পারে। দুজনের অবস্থান আলাদা হলেও বার্তাটি একই, সিরিয়াল কোনো প্রার্থীর নিয়ন্ত্রণে থাকে না, তাই তা নিয়ে দুশ্চিন্তা না করে নিজের প্রস্তুতিতেই মনোযোগ রাখা ভালো।
না জানা প্রশ্নে যা করবেন
ভাইভা বোর্ড অনেক সময় এমন প্রশ্ন করে যার উত্তর প্রার্থীর জানা নেই, আর পর্যালোচিত একাধিক অভিজ্ঞতায় দেখা যায়, উত্তর না জানলে প্রার্থীরা অনুমান না করে বিনয়ের সঙ্গে তা স্বীকার করেছেন। জাফর আহাম্মদ ইউনেসকো বিশ্ব ঐতিহ্যের সংখ্যা বলতে না পেরে ক্ষমা চেয়েছেন, নিয়ামত আলী খান একটি কবিতার লাইন সম্পূর্ণ করতে পারলেও কবির নাম নিয়ে নিশ্চিত না হয়ে তা বিনয়ের সঙ্গে জানিয়েছেন। জাফরের বত্রিশটি প্রশ্নের মধ্যে সাতটির সন্তোষজনক উত্তর দিতে পারেননি তিনি, তবু শেষ পর্যন্ত সুপারিশপ্রাপ্ত হয়েছেন। এই একটি অভিজ্ঞতা অন্তত মনে করিয়ে দেয়, প্রতিটি প্রশ্নের উত্তর জানা সাফল্যের পূর্বশর্ত নয়।
হঠাৎ দাঁড়িয়ে বলতে বললে
কিছু বোর্ড প্রশ্ন-উত্তরের বাইরে গিয়েও প্রার্থীর উপস্থিত বুদ্ধি ও উপস্থাপনা যাচাই করে। মো. শাহাদাত হোসেনকে হঠাৎ দাঁড়িয়ে জাতিসংঘে বাংলাদেশের প্রতিনিধি হিসেবে তিন-চার মিনিটের একটি বক্তব্য দিতে বলা হয়েছিল, আর তাজবীউল ইসলাম ইসকেমকে একটি কাল্পনিক ঘূর্ণিঝড় পরিস্থিতিতে উপকূলের বাসিন্দাদের আশ্রয়কেন্দ্রে যেতে উদ্বুদ্ধ করার মতো একটি প্ররোচনামূলক বক্তব্য দিতে বলা হয়, প্রায় দুই মিনিট বলার পর বোর্ড তাঁকে থামিয়ে দেয়। এ ধরনের প্রশ্নের জন্য আগে থেকে নির্দিষ্ট কোনো প্রস্তুতি সম্ভব নয়, তবে সংক্ষিপ্ত ও গোছানো বক্তব্য দ্রুত সাজিয়ে ফেলার অভ্যাস থাকলে এই মুহূর্তগুলো সামলানো সহজ হয়।
এই বিশ্লেষণে ব্যবহৃত অভিজ্ঞতা
অপেক্ষা ও বোর্ডের গঠন নিয়ে নিয়ামত আলী খান, মো. ফয়সাল, সালাহ্ উদ্দিন কাদের ও এস এম খালেদ চৌধুরী; কথোপকথন ও নার্ভাসনেস নিয়ে নিশাত বিনতে রায়হান, আবীর হোসেন ও জাফর আহাম্মদ; আর হঠাৎ বক্তব্য দেওয়ার অভিজ্ঞতার জন্য মো. শাহাদাত হোসেন ও তাজবীউল ইসলাম ইসকেমের প্রকাশিত গল্প ব্যবহার করা হয়েছে। প্রতিটি গল্পের শেষে সংশ্লিষ্ট মূল প্রতিবেদন যুক্ত আছে।
Learnera.xyz-এর ব্যবহারিক শিক্ষা
- বাইরে অপেক্ষার সময় অন্য প্রার্থীর মুখ দেখে বোর্ডের মেজাজ আন্দাজ করার চেষ্টা না করে আশপাশের কারও সঙ্গে টুকটাক কথা বলে স্বাভাবিক থাকুন।
- ভাইভা দশ-বারো মিনিটেও শেষ হতে পারে, আধা ঘণ্টাও গড়াতে পারে, সময়ের দৈর্ঘ্য দিয়ে নিজের পারফরম্যান্স বিচার করবেন না।
- বোর্ডকে প্রতিপক্ষ না ভেবে একটি পেশাদার কথোপকথন হিসেবে দেখুন; পর্যালোচিত একাধিক অভিজ্ঞতায় প্রার্থীরা পরিবেশকে আলোচনামূলক বলেছেন।
- বাইরের নার্ভাসনেস ভেতরের অভিজ্ঞতার নির্ভরযোগ্য পূর্বাভাস নয়; পর্যালোচিত কয়েকজন প্রার্থী ঢোকার পর স্বস্তি পাওয়ার কথা বলেছেন।
- নিজের সিরিয়াল নিয়ে দুশ্চিন্তা না করে সেই সময়টুকু শেষ মুহূর্তের প্রস্তুতিতে কাজে লাগান।
- না জানা প্রশ্নে অনুমান না করে বিনয়ের সঙ্গে তা স্বীকার করুন, আর হঠাৎ দাঁড়িয়ে বলতে বললে সংক্ষিপ্ত ও গোছানো বক্তব্য দ্রুত সাজানোর অনুশীলন রাখুন।
ভাইভার প্রশ্নের প্রস্তুতিও একসঙ্গে নিন
পরিবেশ নিয়ে মানসিক প্রস্তুতির পাশাপাশি প্রশ্নের ধরন নিয়েও প্রস্তুতি জরুরি। Learnera.xyz-এ প্রকাশিত ভাইভা অভিজ্ঞতার পূর্ণ তালিকা পড়ে দেখতে পারেন, আর শুরু করতে ব্যবহার করতে পারেন বিগত পরীক্ষার প্রশ্ন এবং স্টাডি গাইড। প্রতিটি ভাইভাই আলাদা, তবে প্রস্তুতি আর স্থিরতা মিলিয়ে পরিবেশটাকে নিজের পক্ষে আনা সম্ভব।